ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ নিয়ে নানা বিতর্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (২২ জানুয়ারি) : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে বোর্ড অব পিস। যুদ্ধবিরতির শুরু থেকে এ বিষয়ে জানা গেলেও যতই দিন যাচ্ছে, এ বিষয়কে ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ। সামনে আসতে শুরু করেছে নানা ধরনের বিতর্ক।

নির্বাহী বোর্ডের সদস্যদের তালিকায় এরই মধ্যে ঠাঁই পেয়েছেন ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসন সমর্থনকারী ও বরাবরই ফিলিস্তিনবিরোধী হিসেবে পরিচিত সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। এ ছাড়া ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও রয়েছেন সেই বোর্ডে। স্থায়ী সদস্যপদের জন্য ১০০ কোটি ডলার ফি এবং জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন–এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।

কারা ট্রাম্পের বোর্ড অব পিসে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছেন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের ওই বোর্ডে যোগ দেওয়ার জন্য বিশ্বের বহু নেতার কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা ডা সিলভা, সাইপ্রাসের প্রেসিডেন্ট নিকোস ক্রিস্টোদুলিদেস, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লিয়েন, গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোতাকিস, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, জর্ডানের প্রধানমন্ত্রী জাফার হাসান, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি, পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোৎসকি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার।

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সনকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং তিনি বিষয়টি ‘গভীরভাবে বিবেচনা করছেন’ বলে জানা গেছে। থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, তারা প্রস্তাবের বিস্তারিত পর্যালোচনা করছে।

বেশ কয়েকজন নেতা এরই মধ্যে প্রকাশ্যে অংশগ্রহণে সম্মতি দিয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রামা, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই, হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান, কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ত তোকায়েভ, প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা, উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিয়োইয়েভ, ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক তো লাম, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো (তিনি বলেছেন অংশ নিতে ‘প্রস্তুত’), কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও যোগ দিতে সম্মত হয়েছেন, তবে তিনি সদস্য হতে কোনো অর্থ দেবেন না বলে জানিয়েছেন।

যোগ দেওয়ার শর্ত কী?
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, যোগ দেওয়ার জন্য কঠোর কোনো শর্ত নেই। তবে যারা তিন বছরের পরিবর্তে স্থায়ী সদস্য হতে চান, তাদের ১০০ কোটি ডলার দিতে হবে। কর্মকর্তারা বলেন, এই অর্থ গাজা পুনর্গঠনে ব্যবহার করা হবে।

তবে রয়টার্সের দেখা চিঠি ও খসড়া সনদ অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার পরও আজীবনের জন্য বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকবেন। এই বোর্ডকে ভবিষ্যতে অন্যান্য বৈশ্বিক সংঘাত মোকাবিলায় সম্প্রসারণ করতে চান।
বোর্ড অব পিস কি জাতিসংঘকে দুর্বল করবে?

চিঠিতে ট্রাম্প লিখেছেন, এই বোর্ড ‘বৈশ্বিক সংঘাত সমাধানে এক সাহসী নতুন পথ’ শুরু করবে। এতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ শান্তি প্রতিষ্ঠা, শান্তি রক্ষা ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার দায়িত্ব এই পরিষদের।

ইসরায়েলি পত্রিকা হারেৎজ জানিয়েছে, সনদে ‘আরও দ্রুত ও কার্যকর আন্তর্জাতিক শান্তি-নির্মাণ সংস্থা’র প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে এবং উল্লেখ করা হয়েছে স্থায়ী শান্তির জন্য ‘বারবার ব্যর্থ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সরে আসার সাহস’ দরকার।

হোয়াইট হাউস দাবি করছে, এই বোর্ড জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র এএফপি সংবাদ সংস্থাকে বলেছে, এই সনদ ‘গাজার একমাত্র কাঠামোর বাইরে’। তিনি আরও বলেন, ‘এটি বড় ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করে, বিশেষ করে জাতিসংঘের নীতি ও কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধা সম্পর্কে, যা কোনো অবস্থাতেই প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে না।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের থিংক ট্যাংক কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফটের খালেদ এলগিন্ডি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, ‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন ধারণা আসছে যে তারা শান্তি বোর্ডের পরিধি আরও বিস্তৃত করতে এবং এমনকি বর্তমান জাতিসংঘ ব্যবস্থা প্রতিস্থাপনের কথাও বলতে চায়। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে গাজা দিয়ে শুরু হতে পারে, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এটি বোর্ডের শেষ নয়।’

এরই মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন কমিয়েছে এবং গাজা বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদের পদক্ষেপ ঠেকাতে ভেটো ব্যবহার করেছে। ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি ট্রাম্প জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন ও জাতিসংঘ ডেমোক্রেসি ফান্ডসহ ৩১টি জাতিসংঘ সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের স্মারকে স্বাক্ষর করেন।
বোর্ডটি কীভাবে পরিচালিত হবে?

দুটি অধীনস্থ উচ্চপর্যায়ের বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর একটি প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী বোর্ড, বিনিয়োগ ও কূটনীতির ওপর উচ্চপর্যায়ের নজরদারি করবে। আরেকটি গাজা নির্বাহী বোর্ড, গাজায় মাঠপর্যায়ের কাজ তদারকি করবে, যা পরিচালনা করবে ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা।

ট্রাম্প সাত সদস্যের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী বোর্ডের চেয়ারম্যান হবেন। অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।
ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিরা কি প্রতিনিধিত্ব পাচ্ছেন?

কোনো নির্বাহী বোর্ডেই ফিলিস্তিনি সদস্য নেই। গাজা নির্বাহী বোর্ডে মাত্র একজন ইসরায়েলি রয়েছেন। তিনি রিয়েল এস্টেট ধনকুবের ইয়াকির গাবাই, যিনি ইসরায়েলে জন্মগ্রহণ করলেও বর্তমানে সাইপ্রাসে থাকেন। বোর্ডে কাতার ও তুরস্কের রাজনীতিকরাও রয়েছেন। তারা যুদ্ধে ইসরায়েলের ভূমিকার সমালোচক।

ফিলিস্তিনি রাজনীতিক মুস্তাফা বারঘৌতি বিবিসিকে বলেন, ফিলিস্তিনিরা ‘আরও বিস্তৃত প্রতিনিধিত্ব’ আশা করেছিলেন। তিনি এটিকে ‘কিছু আন্তর্জাতিক উপাদানসহ একটি মার্কিন বোর্ড’ বলে বর্ণনা করেন এবং পুনর্গঠনের জন্য ইসরায়েল রাফাহ ক্রসিং খুলবে কি না, সে বিষয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন।

এদিকে নেতানিয়াহুর দপ্তর জানায়, নির্বাহী বোর্ড গঠনের আলোচনায় ইসরায়েলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এবং এই উদ্যোগ ছিল ‘সমন্বয়হীন’। বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ এটিকে ‘কূটনৈতিক ব্যর্থতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বলেন, গাজার জন্য প্রশাসনিক কমিটি নয়, হামাসকে অপসারণই প্রয়োজন।
বোর্ড অব পিস কি গাজা সমস্যার সমাধান করতে পারবে?

এই বোর্ডের চ্যালেঞ্জের পরিসর বিশাল। জাতিসংঘের হিসাবে, গাজার ৮০ শতাংশ ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ৬ কোটি টন ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছে। সহায়তা সংস্থাগুলো বলছে, কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও ইসরায়েলি বিধিনিষেধ এখনো ত্রাণ কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা। হামাস জানিয়েছে, একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চুক্তির অংশ হিসেবেই তারা নিরস্ত্রীকরণ বিবেচনা করবে। অন্যদিকে ইসরায়েল বলছে, হামাস নিরস্ত্র না হলে তারা স্থল সেনা প্রত্যাহার করবে না। এই বাস্তবতায় ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস কত দ্রুত টেকসই শান্তির পথে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে পারবে, তা এখনো অনিশ্চিত। সূত্র: বিবিসি

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ