ইসরায়েলকে নিয়ে ট্রাম্পের দলে নতুন বিভাজন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (২৮ নভেম্বর) : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ১৫ নভেম্বর জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান মার্জোরি টেইলর গ্রিনের প্রতি তার সমর্থন বাতিল করেন। এ ঘটনাকে অনেকেই সাধারণ রাজনৈতিক নাটক বলে ভেবেছিলেন। কিন্তু ঘটনাটি আসলে এর চেয়ে অনেক গভীর। এতে প্রতীয়মান হয়, রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে একটি বড় ধরনের বিভাজন তৈরি হয়েছে। এই বিভাজন শুধু ব্যক্তিগত বিরোধ নয়। এটি ভবিষ্যতে ট্রাম্পের পরে কারা তার দলের রক্ষণশীল আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কী হবে তা নিয়ে একটি বড় লড়াইয়ের ইঙ্গিত দেয়।

রিপাবলিকান রাজনীতির আগের বিভাজন ছিল অভিবাসন বা অর্থনীতি নিয়ে। কিন্তু এবার মূল সংঘাত পররাষ্ট্রনীতিকে কেন্দ্র করে। আর সেই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইসরায়েল। বহু দশক ধরে ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছিল প্রায় অটুট একটি নীতি। কিন্তু এখন প্রথমবার রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই প্রকাশ্যে প্রশ্ন উঠছে- ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সমর্থন দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে মানানসই কি না। এই বিতর্ক আমেরিকার ডানপন্থি রাজনীতিকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলবে, সেটিও এই বিভাজনকে প্রভাবিত করতে পারে।

মার্জোরি টেইলর গ্রিন দীর্ঘদিন ট্রাম্পের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি মাগা (মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন) আন্দোলনের একটি প্রধান মুখ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু এখন তিনি নিজেকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে উপস্থাপন করছেন। ট্রাম্পের সঙ্গে তার দূরত্ব তাই কেবল ব্যক্তিগত মতবিরোধ নয়। এটি রিপাবলিকান পার্টিতে দুই ধারার সংঘর্ষকে তুলে ধরে। একদিকে রয়েছে মাগা অনুগত গোষ্ঠী, যারা ট্রাম্পকে আন্দোলনের অপরিহার্য নেতা মনে করেন এবং প্রচলিত প্রো-ইসরায়েল অবস্থানকে ধর্মীয় ও আদর্শগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। এই গোষ্ঠী ইভাঞ্জেলিকাল খ্রিষ্টানদের সমর্থন পায় এবং ইসরায়েলকে ধর্মীয় দৃষ্টিতে ‘বিশেষ মিত্র’ হিসেবে দেখে। অন্যদিকে রয়েছে আমেরিকা ফার্স্ট জাতীয়তাবাদীরা, যাদের মধ্যে টাকার কার্লসন, স্টিভ ব্যানন এবং এখন গ্রিনও রয়েছেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি যুদ্ধ ও জোটের প্রতি গভীর সংশয়ী। তাদের মতে, বিদেশি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ নষ্ট হয়েছে। একইভাবে ইসরায়েলকে নিঃশর্তভাবে সহায়তা করাও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে যায় না।

ইসরায়েল ইস্যুতে এই মতপার্থক্য এখন পার্টির ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে গাজায় ইসরায়েলি হামলা এবং মানবিক সংকট রিপাবলিকান ভোটারদের মনোভাবেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। আমেরিকা ফার্স্ট শিবির মনে করে ইসরায়েল হচ্ছে আরেকটি উদাহরণ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে বিপুল অর্থ সাহায্য দিয়ে যাচ্ছে, অথচ দেশে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা রয়ে গেছে। তারা ইউক্রেন যুদ্ধের মতোই ইসরায়েল প্রশ্নেও বলেন- যুক্তরাষ্ট্রের আর বিদেশি সংঘাতে নেতৃত্ব দেওয়া উচিত নয়। অন্যদিকে মাগা শিবির ইসরায়েলকে তাদের পরিচয়গত রাজনীতির অংশ মনে করে। তাদের ভাষায়, ইসরায়েলকে সমর্থন করা মানে ধর্ম ও সভ্যতাকে রক্ষা করা। গ্রিন যখন গাজার হামলাকে ‘গণহত্যা’ বলেন, তখন প্রো-ইসরায়েল লবি তাকে কঠোরভাবে সমালোচনা করে এবং এটিকে ‘আমেরিকান মূল্যবোধের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে দাবি করে। তবে তরুণ রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালের মার্চের পিউ জরিপ অনুযায়ী, ৫০ বছরের নিচে রিপাবলিকানদের মধ্যে ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ২০২২ সালের ৩৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি এক বিরল পরিবর্তন।

রিপাবলিকান পার্টির পুরোনো বৈদেশিক নীতি, বিশেষ করে জর্জ ডব্লিউ বুশ আমলের নব্য-রক্ষণশীল নীতি, অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। সেই নীতি দীর্ঘ যুদ্ধকে ন্যায্যতা দিত এবং বিশ্বজুড়ে আমেরিকান শক্তি প্রয়োগকে স্বাভাবিক ভাবত। ট্রাম্প ২০১৬ সালে সেই মতবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। তিনি ‘ফরেভার ওয়ার’-এর সমালোচনা করতেন। কিন্তু একই সময়ে ইসরায়েলের প্রতি তার ব্যক্তিগত সমর্থন ছিল অটুট। তিনি জেরুজালেমে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস সরান, গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলি সার্বভৌমত্ব স্বীকার করেন। এতে স্পষ্ট হয় যে ট্রাম্প আমেরিকা ফার্স্ট বললেও পুরোনো লবিগুলোর প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। কিন্তু এখন, ট্রাম্পের প্রভাব কমে আসায় রিপাবলিকানদের মধ্যে নতুন জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব উঠে আসছে, যারা ইসরায়েল প্রশ্নে আগের মতো অনুগত নয়।

এই পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য ঝুঁকির পাশাপাশি সুযোগও তৈরি করছে। ঝুঁকি হলো যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অস্থির হয়ে উঠতে পারে। কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদ, কখনো হস্তক্ষেপ- এমন দোলাচল দেখা দিতে পারে। তবে বড় সুযোগ হলো- প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থিদের একটি অংশ ইসরায়েলে সামরিক সাহায্য দেওয়া নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ, নাগরিক সমাজ ও প্রবাসী সম্প্রদায়ের কাছে এটি যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রজন্মের রক্ষণশীলদের সঙ্গে সংলাপের সুযোগ। তারা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ‘যুদ্ধ কমানো’, ‘ন্যায্যতা’, ‘স্থিতিশীলতা’ এবং ‘পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যয় কমানো’- এ ধরনের যুক্তি তুলতে পারেন। এ ধরনের আলোচনায় রিপাবলিকানদের নতুন অংশ বিশেষভাবে সাড়া দিচ্ছে। সূত্র: আল-জাজিরা

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ