সর্বস্ব বিক্রি করে বিনিয়োগ করবেন না

নিউজ ডেস্ক, এবিসি নিউজ বিডি, ঢাকা: শেয়ারবাজারের সূচক ও লেনদেন নিয়ে ভয়ের কিছু নেই বলে দাবি করেছে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। সংস্থাটির কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমানে সূচক যে পর্যায়ে গেছে, সেটিকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা যাবে না। সূচক নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। আর বাজারের লেনদেন যেখানে পৌঁছেছে, তা সামলানোর দক্ষতা ও সক্ষমতা দুই-ই রয়েছে ডিএসইর।
সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএসইর নেতারা এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সরকার, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ডিএসইসহ বিভিন্ন মহলের নানা উদ্যোগের ফলে অর্থনীতির অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজার ভালো একটি জায়গায় অবস্থান নিয়েছে। তবে ধার-দেনা, বউয়ের গয়না, জমি বিক্রি করে কেউ বাজারে বিনিয়োগ করবেন না। কেবল তাঁরা বাজারে আসুন, যাঁদের উদ্বৃত্ত অর্থ রয়েছে। তা-ও আবার উদ্বৃত্ত অর্থের পুরোটা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করবেন না। কারণ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ ও প্রতিটি শেয়ারের অপর নাম ঝুঁকি।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ডিএসইর সভাপতি বিচারপতি সিদ্দিকুর রহমান মিয়া। এ ছাড়া বক্তব্য দেন সংস্থাটির পরিচালক রকিবুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক

কে এ এম মাজেদুর রহমান। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন ডিএসইর পরিচালক রুহুল আমিনসহ একাধিক পরিচালক। রাজধানী ঢাকার মতিঝিলে ডিএসই ভবনে এ সংবাদ সম্মেলন করা হয়।

বাজারের সূচক ও লেনদেন ‘তরতর’ করে বাড়ছে, এর ব্যাখ্যায় সংস্থাটির পরিচালক রকিবুর রহমান বলেন, এখন যেটা হচ্ছে শেয়ারের হাতবদল বেশি হচ্ছে। একজন ছোট বিনিয়োগকারী হিসেবে আমি যেটা করি, সকালে এসে যদি ভালো কয়েকটা কোম্পানি পাই, হয়তো দুই-চার টাকা হলে আমি ওটা ছেড়ে দিই। আবার একটা ভালো কোম্পানির কম দাম থাকলে সেটা কিনি। এ রকম আমি যদি এক কোটি টাকা কেনাবেচা করি তাতে দুই কোটি টাকার লেনদেন হয়। এই রকমভাবে একজন ১০ কোটি, একজন ২০ কোটি, আরেকজন ৫০ কোটি টাকার লেনদেন করে। তাতে করে লেনদেন বেড়ে গেছে।

সূচক হঠাৎ করে বাড়ার কারণ হিসেবে রকিবুর রহমান বলেন, ব্যাংক, ফাইন্যান্স, জ্বালানি খাতসহ বড় বড় পরিশোধিত মূলধনের শেয়ার যখন মুভ করে তখন সূচকে প্রভাব পড়ে। যে সূচকগুলো নিচে পড়ে ছিল সে সূচকগুলোতে রাতারাতি প্রভাব পড়েছে বলে ‘তরতর’ করে সূচক বাড়ছিল। ২০০৯-১০ সালের শেষের দিকেও ব্যাংকের শেয়ারের দাম যখন বেড়েছিল তখন সূচকে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছিল। সেই হিসাবে এখনকার পুঁজিবাজারে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই, চিন্তার কিছু নেই। এখন যে পর্যায়ে সূচক আছে, এটাতে ভয়ের কিছু নেই।

এ প্রসঙ্গে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাজেদুর রহমান বলেন, সূচক দিয়ে যদি আমরা বাজারের একটা লক্ষ্য নির্ধারণ করি তাহলে সেটি ঠিক হবে না। আমাদের দেখতে হবে লেনদেন ও শেয়ারের দাম। বাজারের লেনদেনের যে পরিমাণ তা সামলানোর দক্ষতা ও সক্ষমতা ডিএসইর রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে লেনদেন বাড়ার কারণ হিসেবে বিদেশি বিনিয়োগের কথাও উল্লেখ করেন ডিএসইর এমডি। তিনি বলেন, ২০১০ সালে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে ৮ হাজার ৭০০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ২১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তার একটা স্বাভাবিক প্রভাব পুঁজিবাজারে আমরা দেখতে পাচ্ছি।

ডিএসইর সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান আরও বলেন, পুঁজিবাজারের বিনিয়োগটাই ঝুঁকিপূর্ণ। পুঁজিবাজারে যদি সব সময় লাভ হতো তাহলে পৃথিবীতে আর কোনো ব্যবসা থাকত না। সবাই এখানে বিনিয়োগ করে, এখান থেকে টাকা আয় করে আরামে থাকত। ঝুঁকিপূর্ণ এ বাজারের ঝুঁকি কমাতে হলে বাজারটা বুঝতে হবে, যে কোম্পানিতে বিনিয়োগ করবেন সেটির পারফরম্যান্স জানতে হবে। কোম্পানি কী ব্যবসা করে, তার আয় কেমন, গত পাঁচ বছর কী লভ্যাংশ দিয়েছে—এসব সম্পর্কে জানতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নোত্তর পর্বে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় দৈনিকে শেয়ারবাজার নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখিত খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের বক্তব্যের প্রসঙ্গে ডিএসইর বক্তব্য জানতে চান সাংবাদিকেরা। জবাবে ডিএসইর পরিচালক রকিবুর রহমান ওই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, তিনি কিসের ভিত্তিতে এ মত দিয়েছেন তা আমরা জানি না। তাঁর ওই বক্তব্যের সঙ্গে আমি মোটেই একমত না।

গতকাল জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে শেয়ারবাজারের সাম্প্রতিক অবস্থা সম্পর্কে ইব্রাহিম খালেদের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেছিলেন, ‘বাজারের সাম্প্রতিক উত্থানকে খুব বেশি স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত বলে মনে হচ্ছে না।…আর পুরোনো খেলোয়াড়েরা সেটিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের মতো খেলাধুলা চালাচ্ছেন।’

রকিবুর রহমান বলেন, ‘বাজারের লেনদেন এখন অনেক বেশি স্বচ্ছ। টান দিলে আমাদের সবার লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। সে রকম যদি কেউ মনে করে ১০-৫টা লোক বাজারকে প্রভাবিত করছে, তবে তাদের নাম বলেন। যারা বাজারে কারসাজি করছে। সেটা না করে পুরোনো খেলোয়াড়েরা খেলাধুলা করছেন, এটা বলা কতটা যৌক্তিক?’

২০১০ সালের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। ওই তদন্ত প্রতিবেদনে রকিবুর রহমান ও সালমান এফ রহমানের বিষয়ে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছিল।

ডিএসইর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইব্রাহিম খালেদ গতকাল বলেন, পৃথিবীর যেসব উন্নত দেশে উন্নত সার্ভেল্যান্স ব্যবস্থা রয়েছে সেখানেও খেলোয়াড়েরা খেলে। কাজেই সার্ভেল্যান্স থাকলে বা উন্নত হলে খেলোয়াড়েরা খেলতে পারে না, কথাটা সঠিক নয়। আমাদের সার্ভেল্যান্স ব্যবস্থা কতটা ভালো তা এখনো প্রমাণ হয়নি। তবু আমরা আশা করব সার্ভেল্যান্স ভালো থাকবে।

ইব্রাহিম খালেদ আরও বলেন, ‘আমাদের মতো দেশে অর্থবাজারের (মানি মার্কেট) সঙ্গে পুঁজিবাজারের তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। দেশের অর্থনীতি যে ভালো, সেটি মূলত অর্থবাজারের কারণেই। দেশে শিল্প-বাণিজ্য যা কিছু হচ্ছে তার সিংহভাগই হচ্ছে অর্থবাজারের মাধ্যমে। তাই দেশের অর্থনীতি ভালো বলে পুঁজিবাজার চাঙা হচ্ছে, এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। তবে আমরাও আশা করি, শেয়ারবাজারটা ভালো থাকুক। সাম্প্রতিক সময়ে বাজারটা সাবলীলভাবে ভালো হয়েছে, সেটি মনে হয়নি। খেলোয়াড়েরা যে খেলছেন, এ ব্যাপারে আমি প্রায় নিশ্চিত। খেলোয়াড়েরা যাতে বাজারে বড় রকমের কোনো অঘটন ঘটাতে না পারেন, সে জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা তীক্ষ্ণ নজর রাখবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’

বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘যাঁরা বিনিয়োগ করবেন তাঁরা সতর্কতার সঙ্গে করবেন। এটা অনেকটা নেশার মতো, নেশায় পড়বেন না। বরং চিন্তাভাবনা ও হিসাবনিকাশ করে বিনিয়োগ করবেন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ