একটি পরিচ্ছন্ন সরকারি হাসপাতাল

নিউজ ডেস্ক, এবিসি নিউজ বিডি, ঢাকা: বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স বা দালালের উৎপাত নেই। মূল ফটকে আনসারদের কড়াকড়ি। টিকিট কাটা, টাকা জমা দেওয়া, জরুরি বিভাগ বা বহির্বিভাগে রোগী দেখানো—সব জায়গাতেই শৃঙ্খলা চোখে পড়ে। প্রতিটি তলার প্রতিটি ওয়ার্ড, করিডর, বারান্দা, বাথরুম পরিষ্কার। প্রতিটি তলায় সার্বক্ষণিক নিয়োজিত আছেন চিকিৎসক, নার্স, আয়া, ওয়ার্ডবয়। দুর্গন্ধ এড়াতে নাকে রুমাল চাপতে হয় না।

এটি একটি সরকারি হাসপাতাল। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ২০১২ সালে শুরু হওয়া হাসপাতালটির নাম ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল (নিনস)। এখানে স্নায়ুতন্ত্রের সব ধরনের রোগের চিকিৎসা হয়।

নওগাঁ জেলার আয়শা বেগমের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয় গত ২৯ নভেম্বর। তাঁকে প্রথমে আত্রাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে নওগাঁ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৪ ডিসেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের ছয় তলার মহিলা ওয়ার্ডে তাঁর চিকিৎসা চলছে। কথা গুছিয়ে বলতে তাঁর কষ্ট হয়, তবে অন্যের কথা বুঝতে পারেন।

কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে রোগীদের সঙ্গে কথা বলা হয়। গত শুক্রবার সকালে আয়শা বেগম বলেন, এই হাসপাতালে ডাকলেই নার্স আসেন। সব সময় চিকিৎসক উপস্থিত থাকেন। হাসপাতালের চিকিৎসায় তিনি অনেক আরাম পেয়েছেন। কোনো সরকারি হাসপাতালে তাঁর এমন সুন্দর অভিজ্ঞতা হয়নি।

গত ২৫ অক্টোবর থেকে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৫০ জন রোগী বা তাঁদের আত্মীয়দের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁরা প্রত্যেকেই এই হাসপাতালের পরিবেশ, সেবা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতার প্রশংসা করেছেন। বলেছেন, হাসপাতালের আনসার, ওয়ার্ডবয়, আয়া, নার্স, ওয়ার্ডমাস্টার, চিকিৎসক, পরিচালক সবাই সেবার ব্যাপারে আন্তরিক।

কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে ১৫৬ জন চিকিৎসক, ২০০ নার্স ও ৩৮০ জন বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সহকারী ও কর্মী আছেন। এ ছাড়া কাজ করেন ৫০ জন আনসার। ৩০০ শয্যার হাসপাতালে শয্যা পূরণের হার ১০০ শতাংশ। প্রতিদিন জরুরি বিভাগে রোগী আসে ১২০ জনের বেশি। বহির্বিভাগে আসে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০। স্নায়বিক রোগ চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি প্রায় সবই আছে।

কীভাবে সম্ভব হলো: হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক মো. বদরুল আলম বলেন, ‘দেশে অ্যাপোলো, ইউনাইটেড বা স্কয়ারের মতো ব্যয়বহুল হাসপাতাল আছে। এসব হাসপাতালে রোগীর কমতি নেই। কিন্তু দরিদ্র মানুষের আক্ষেপ, তাঁরা ওই সব হাসপাতালে যেতে পারেন না। সেই আক্ষেপ দূর করার একটা চেষ্টা এই হাসপাতাল তৈরির পেছনে কাজ করেছে। যেকোনো মানুষ এখানে এসে বলবে, অ্যাপোলো বা ইউনাইটেডে না গিয়ে ভুল করিনি।’

হাসপাতালটির ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠার পেছনের কারণ সম্পর্কে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ব্যবস্থাপনায় একটু ভিন্নতা আছে। আর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা হাসপাতাল পরিচালনার ব্যাপারে আন্তরিক। প্রায় সব ব্যাপারে সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা আছে। নিনসের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বিদ্যমান অবস্থার চেয়ে ভালো করা সম্ভব।

ব্যবস্থাপনা: সরকারি হাসপাতালগুলোর বহির্বিভাগে অধ্যাপক বা জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকেরা রোগী দেখেন না। রোগী দেখেন কনিষ্ঠ চিকিৎসকেরা। নিনসের বহির্বিভাগে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের রোগী দেখা বাধ্যতামূলক। এই হাসপাতালে শয্যা খালি না থাকলে রোগী ভর্তি করানো হয় না। মেঝেতে রেখে কোনো রোগীর চিকিৎসা হয় না।

প্রতিদিন সকালে জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকেরা স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী/চিকিৎসকদের নিয়ে প্রতিটি ওয়ার্ড পরিদর্শন করেন। বেলা দেড়টা থেকে দুইটার মধ্যে আবার চিকিৎসকেরা ওয়ার্ড ঘুরে দেখেন। নতুন ভর্তি হওয়া রোগীকে রাতে দেখে যান সংশ্লিষ্ট ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যাপক। হাসপাতালের পরিচালক অথবা যুগ্ম পরিচালক দিন ও রাতে একবার করে হাসপাতাল পরিদর্শন করেন।

চাপ বেশি: চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, প্রতিদিন জরুরি ও বহির্বিভাগে আসা রোগীদের মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ জনের অবস্থা খারাপ থাকে। তাঁদের ভর্তি করানো উচিত। কিন্তু ৩০ থেকে ৩৫ জনের বেশি ভর্তি করানো যায় না।

হাসপাতালটি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহ-উপাচার্য অধ্যাপক রশীদ-ই-মাহবুব বলেন, এই অনুকরণীয় হাসপাতাল থেকে অনেকেরই শেখার আছে। এ ধরনের হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ