খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের উন্নতি অপরিবর্তিত, দেশেই অ্যাডভান্স ট্রিটমেন্ট দেওয়া হচ্ছে: চিকিৎসক
নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (৯ ডিসেম্বর) : রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অপরিবর্তিত আছে। তার স্বাস্থ্যের উন্নতি খুবই ধীরে হচ্ছে। একটি রোগের জটিলতা কেটে গেলে আরেকটি রোগের জটিলতা দেখা দেয়। একটি রোগের প্যারামিটার নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আরেকটি বেড়ে যায়। দীর্ঘদিনের পুরোনো লিভারের জটিলতা না থাকলেও কিডনি নিয়ে উদ্বিগ্ন আছে মেডিকেল বোর্ড। শারীরিক অবস্থা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত খালেদা জিয়াকে আপাতত বিদেশ নিয়ে উন্নত চিকিৎসার কথা ভাবছে না মেডিকেল বোর্ড।
সোমবার (৮ ডিসেম্বর) খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের একজন সদস্য জানিয়েছেন এসব কথা।
তিনি বলেন, ‘ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) স্বাস্থ্যের উন্নতি হচ্ছে। বয়সজনিত কারণে সেরে উঠতে কিছুটা সময় লাগবে। এই দফায় ওনার উন্নতি হচ্ছে খুবই ধীরগতিতে। ওনার মাল্টিপল ডিজিজ (একাধিক রোগ) থাকায় একটি রোগ থেকে সেরে উঠলে আরেকটি দেখা দেয়। লিভারের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও কিডনি জটিলতায় ভুগছেন। কিডনির ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বর্ডার লাইন (ঝুঁকিপূর্ণ সীমা) অতিক্রম করেছে বেশ আগেই। এটি নিয়ন্ত্রণে রাখাই কষ্ট হচ্ছে। এখানে বয়স একটি বড় ফ্যাক্টর।’
মেডিকেল বোর্ডের ওই চিকিৎসক বলেন, ‘প্রতিনিয়ত ডায়ালাইসিস করতে হচ্ছে। ডায়ালাইসিস বন্ধ করলেই কিডনির অবস্থার অবনতি হয়। সিসিইউতে নেওয়ার পর থেকে প্রতিদিন নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। প্যারামিটারগুলো একেবারে ঝুঁকিমুক্ত নয়। সিসিইউতে অ্যাডভান্স ট্রিটমেন্ট দেওয়া হচ্ছে। প্রতি রাতে মেডিকেল বোর্ড বৈঠকে বসে। যেখানে প্রত্যেক চিকিৎসক প্রতিটি রোগ নিয়ে আলোচনা করেন। রিপোর্ট দেখে ওষুধ বন্ধ করেন, আবার চালু করেন। কিছু ওষুধের মাত্রা কমান কিংবা প্রয়োজনে বাড়িয়ে দেন।’
মেডিকেল বোর্ডের আরেকজন সদস্য জানান, চিকিৎসকদের পরামর্শে গুলশানের বাসা থেকে প্রতিদিন খাবার পাঠানো হচ্ছে। খালেদা জিয়ার সঙ্গে সর্বক্ষণ আছেন দুই পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান ও সৈয়দা শামিলা রহমান, গৃহপরিচারিকা ফাতেমা এবং স্টাফ রূপা আক্তার। এ ছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসনের ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার ও ভাইয়ের স্ত্রী কানিজ ফাতেমাও সর্বক্ষণ পাশে থাকছেন। তাদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে কথা বলার চেষ্টা করেন খালেদা জিয়া।
গত ২৩ নভেম্বর রাতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসনকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং ওই রাতেই তাকে সেখানে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে ২৭ নভেম্বর তাকে নেওয়া হয় হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ)। সেখানে এখন পর্যন্ত চিকিৎসাধীন। ৭৯ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসের পাশাপাশি কিডনি, লিভার, ফুসফুস, হৃদযন্ত্র, চোখের সমস্যাসহ নানা রোগে ভুগছেন।
এভারকেয়ার হাসপাতালে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে দুই ডজন দেশি-বিদেশি চিকিৎসক, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে একটি মেডিকেল বোর্ড খালেদা জিয়ার চিকিৎসার তদারকি করছে। মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা প্রতিদিন বৈঠক করে চিকিৎসায় পরিবর্তন আনছেন।
দেশে আসার পর বোর্ডে স্বশরীরে অংশ নিচ্ছেন খালেদা জিয়ার বড় পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি বৈঠক শেষ করে বাসায় ফেরেন। দিনের বেশির ভাগ সময় হাসপাতালে শাশুড়ির শয্যাপাশে কাটান। বাসায় থাকার সময়ও টেলিফোনে তিনি তার শাশুড়ির স্বাস্থ্যের খোঁজখবর রাখছেন। চিকিৎসার বিষয়গুলো তিনি সমন্বয় করছেন। গতকাল বেলা সাড়ে ৩টার দিকে জুবাইদা রহমান এভারকেয়ার হাসপাতালে পৌঁছান।
খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ঘিরে এভারকেয়ার হাসপাতাল এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এএসএফ), প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া কাঁটাতারের ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে হাসপাতালের প্রধান ফটক।
খালেদা জিয়ার অসুস্থতার খবরে এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে ভিড় করছেন নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা। এতে ওই এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নেতা-কর্মীদের সেখানে ভিড় না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
আজও আসছে না এয়ার অ্যাম্বুলেন্স
উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নিতে ভাড়া করা এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি আজ মঙ্গলবার আসছে না। এয়ার অ্যাম্বুলেন্স অপারেটরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবার সকালে তাদের ঢাকায় নামার অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু এয়ার অ্যাম্বুলেন্স অপারেটর সোমবার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কাছে মঙ্গলবারের ওই স্লট বাতিল করার আবেদন করেছে বলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এ নিয়ে পঞ্চমবারের মতো পেছাল খালেদা জিয়ার লন্ডনযাত্রা।
বিএনপি নেতারা বলছেন, লন্ডনযাত্রার বিষয়টি নির্ভর করছে তার শারীরিক অবস্থার ওপর। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ড।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. এনামুল হক চৌধুরী জানান, মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত নিলেই তাকে লন্ডনে নেওয়া হবে। আর যখনই বিএনপি চাইবে, তখনই কাতার সরকার এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করবে। এতে কোনো সমস্যা হবে না।
মনোয়ারুল হক/
