পুতিনের ‘উড়ন্ত ক্রেমলিন’ যেন এক রাজপ্রাসাদ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (৬ ডিসেম্বর) : বিশ্বের অন্যতম সুরক্ষিত নেতা হিসেবে ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দুটি প্রতীক ছাড়া খুব কমই ভ্রমণ করেন। একটি হচ্ছে তার বর্মসজ্জিত লিমুজিন ‘অরাস সেনাট’ এবং অন্যটি হচ্ছে তার জন্য বিশেষভাবে তৈরি প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজ ইলিউশিন আইএল-৯৬-৩০০ পিইউ। এটি আবার ‘ফ্লাইং ক্রেমলিন’ বা ‘উড়ন্ত ক্রেমলিন’ নামে পরিচিত। গত বৃহস্পতিবার তিনি এই উড়োজাহাজে চড়ে ভারত সফরে গেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের যেমন ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’, ঠিক তেমনই পুতিনের রয়েছে ‘উড়ন্ত ক্রেমলিন’। একে বিমান না বলে উড়ন্ত দুর্গ বলাই শ্রেয়। দীর্ঘপাল্লার এবং চার ইঞ্জিনযুক্ত রুশ বিমানটি যেন ছোটখাটো এক প্রাসাদ। কী নেই তাতে!
সংবাদদাতারা বলছেন, পুতিনের ‘ফ্লাইং ক্রেমলিনে’ রয়েছে উন্নত এনক্রিপ্টেড যোগাযোগব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রযুক্তি। মাঝ আকাশে হ্যাকিং বা কোনো বাধা তৈরি হলে তা রুখে দেওয়ার সব কঠোর সুরক্ষার বন্দোবস্ত করা রয়েছে বিমানে। শত্রুপক্ষের হামলা থেকে সব রকমভাবে রাষ্ট্রনেতাকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিতে পারে ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’-এর রুশ সংস্করণটি।
১৯৪৫ সালে তৈরি সোভিয়েত যুগের লিমুজিন জেডআইএস-১১০-এর অনুকরণে তৈরি গাড়িটি রাশিয়ার অটোমোবাইল সংস্থা অরাস-এর নকশা করা। গাড়িটি তৈরি করেছে রাশিয়ার অটোমোটিভ প্রযুক্তি উন্নয়ন সংস্থা ‘সেন্ট্রাল সায়েন্টিফিক রিসার্চ অটোমোবাইল অ্যান্ড অটোমোটিভ ইঞ্জিন ইনস্টিটিউট’ ওরফে ‘নমি’।
ইলিউশিন ডিজাইন ব্যুরো ১৯৮০ সালে দূরপাল্লার এই রুশ বিমানটি তৈরি করে। এটি ১৯৮৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর প্রথমবার আকাশে উড়েছিল। ১৯৯০ সাল থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে রুশ প্রেসিডেন্টের বিদেশ সফরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বিমানটি। আইএল-৯৬-৩০০পিইউ দূরপাল্লার আইএল-৯৬ প্ল্যাটফর্মে তৈরি, যার দৈর্ঘ্য ৫৫ দশমিক ৩৫ মিটার এবং ডানা বা উইংস্প্যান ৬০ দশমিক ১২ মিটার।
বিমানটিতে রয়েছে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত ডাইনিং ও কনফারেন্স রুম। এ ছাড়া বিমানে সিনিয়র সদস্যদের জন্য আলাদা অফিস রুম আছে। বিমানে সব সময় মজুত থাকে প্রেসিডেন্টের জন্য রক্ত ও চিকিৎসক। রাস্তায় চলার সময় প্রেসিডেন্টের গাড়ির আগে-পিছে যেমন আরও অন্য গাড়ি থাকে কনভয়ে, তেমন সুরক্ষার জন্য প্রেসিডেন্টের বিমানের আগেও একাধিক নজরদারি বিমান উড়তে থাকে।
প্রেসিডেন্টের বিমানের সুরক্ষাব্যবস্থাও দুর্ভেদ্য দুর্গের মতোই। শত্রুর রাডারের নজর এড়াতে এবং ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা আটকানোর জন্য ইলেকট্রনিক প্রতিরোধব্যবস্থা যেমন রয়েছে, তেমনই ক্ষেপণাস্ত্র এড়াতে ইনফ্রারেড ডিকয়-ব্যবস্থা বসানো রয়েছে বিমানে।
অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির যোগাযোগমাধ্যম রয়েছে বিমানে। ফলে যেকোনো সময়ে বিমানে বসেই মস্কোকে জরুরি নির্দেশ দিতে পারেন প্রেসিডেন্ট। বিশ্বের যে প্রান্তেই বিমানটি উড়ুক না কেন, রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রাগারের সঙ্গে যেকোনো সময়ে এনক্রিপ্টেড এবং নিরাপদ যোগাযোগ করতে পারেন প্রেসিডেন্ট।
রুশ প্রেসিডেন্টের বিমানের অন্দরসজ্জাও চোখ ধাঁধানো। দামি আখরোট কাঠের আসবাব, চামড়া ও গৃহসজ্জার সামগ্রী, তাতে বসানো স্বর্ণের পাত। রান্নাঘর ও খাবারের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা। ব্যায়ামের জন্য ফিটনেস এরিয়া বা জিমও।
একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পুতিনের জেটে একটি ‘পারমাণবিক বোতাম’ রাখা রয়েছে। যদিও এটি এখনো নিশ্চিত নয়। পারমাণবিক বোতাম মূলত একটি জটিল ‘চেইন-অব-কমান্ড সিস্টেম’। কঠোর প্রোটোকল ও সুরক্ষাব্যবস্থা জড়িয়ে থাকে এর সঙ্গে। একক কোনো ব্যক্তির নির্দেশে এই বোতামটি কার্যকর হয় না। একাধিক নিরাপত্তা ধাপ পেরিয়ে পারমাণবিক আক্রমণের নির্দেশে কোড সম্পূর্ণ করা সম্ভব।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার পারমাণবিক অনুমোদন প্রক্রিয়াটি রুশ প্রেসিডেন্টের চেগেট পারমাণবিক ব্রিফকেসের সঙ্গে সংযুক্ত। বিমানের কোনো পৃথক ‘বোতাম’ নেই। যদিও বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বিশ্বাস করেন যে প্রয়োজনে জেটটি পারমাণবিক কমান্ড পরিচালনা করতে সক্ষম। তবে এযাবৎ এই বিষয়ে ক্রেমলিন বা মস্কো কেউই কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।
ভারতের আকাশে পুতিনের বিমান প্রবেশের মুহূর্ত থেকে ল্যান্ডিং পর্যন্ত এক দিনে হাজার হাজার বার বিমানটির গতিপথ নজরবন্দি করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট পুতিনের যাত্রাপথটি আঁটসাঁট নিরাপত্তার জালে মুড়ে ফেলে রুশ পাহারাদার প্রযুক্তি। ফলে পুরো রুটেই নজিরবিহীন সতর্কতা বজায় রাখা হয়। ভারতীয় আকাশসীমায় প্রবেশের পর বিমানটিকে নজরদারি বিমানের সঙ্গে দেখা গেছে বলে সূত্রের দাবি।
ফ্লাইট রাডার ২৪ থেকে প্রাপ্ত সূত্র অনুসারে, ভ্লাদিমির পুতিনের জেট বিমানটি বৃহস্পতিবার গোটা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি নজরদারির আওতায় থাকা বিমান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ভারত সফরের পথে নয়া নজির গড়ে ফেলেছে পুতিনের ‘ফ্লাইং ক্রেমলিন’ বা উড়ন্ত দুর্গটি।পিটিআই/রয়টার্স/ এনডিটিভি।
মনোয়ারুল হক/
