আরাকান আর্মির গুলিতে শিশু হোজাইফার মৃত্যু: সীমান্তজুড়ে শোক-উদ্বেগ
চট্টগ্রাম ব্যুরো, এবিসিনিউজবিডি, (৯ ফেব্রুয়ারি) : মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সশস্ত্র সংঘর্ষের জেরে আরাকান আর্মির ছোড়া গুলিতে আহত হয়ে দীর্ঘ ২৭ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে মারা গেছে শিশু হোজাইফা আফনান (১২)।
রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টায় কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল তেচ্ছি ব্রিজ এলাকার কবরস্থানে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়।
জানাজা ও দাফনে অংশ নিতে সকাল থেকেই কবরস্থানে ভিড় জমান স্থানীয় বাসিন্দারা। এলাকার সবার প্রিয় শিশুটিকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে পুরো হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকা। শোক ও আতঙ্কের আবহ ছড়িয়ে পড়ে সীমান্তজুড়ে।
নিহত হোজাইফার বাবা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘হয়তো আমার মেয়ের হায়াত এইটুকুই ছিল। কিন্তু আমাদের গ্রামসহ সীমান্তে বসবাসকারী আর কোনো পরিবারের বুক যেন খালি না হয়। আমি সরকারের কাছে সীমান্তে নজরদারি ও নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আরাকান আর্মি প্রায়ই বাংলাদেশের ভূখণ্ডে এসে নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বুক খালি হওয়ার কষ্ট কতটা ভয়াবহ, আমি জানি। আর কেউ যেন এই কষ্ট না পায়।’
স্থানীয় বাসিন্দা আলমগীর বলেন, ‘আমার নাতনি হোজাইফার মৃত্যুতে আমরা সবাই গভীরভাবে শোকাহত। এই মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। উখিয়া-টেকনাফ এলাকায় লাখ লাখ মানুষ বসবাস করে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে জরুরি।’
হোজাইফা আফনান স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। সে পরিবারের বড় সন্তান। পড়াশোনায় মেধাবী ও স্বভাবে ভদ্র এই শিশুটি প্রতিবেশী ও স্বজনদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ছিল। তার অকাল মৃত্যুতে এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
এ বিষয়ে কক্সবাজার বিএনপির সভাপতি ও বিএনপির মনোনীত প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘মায়ানমারে চলমান দুই পক্ষের গৃহযুদ্ধের কারণে সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারী সবাইকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সীমান্ত এলাকায় এ ধরনের সংঘর্ষের প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে পড়ে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গারা ইতোমধ্যে আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।’
জেলা জামায়াতের আমির ও জামায়াতের প্রার্থী নুর আহমদ আনোয়ারী বলেন, ‘আরাকান আর্মি মায়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকা দখলের পর থেকেই সেখানে তীব্র সংঘর্ষ চলছে, যা আমাদের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। এ পরিস্থিতি সম্পর্কে বারবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করা হয়েছে। তবুও দুঃখজনকভাবে এই সহিংসতার নির্মম শিকার হয়েছে আমাদের মেধাবী শিশু হোজাইফা।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও সংঘাত যেন আমাদের সীমান্তে ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সীমান্তে বসবাসকারী নিরীহ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাই হোক সবার প্রথম অগ্রাধিকার।’
উল্লেখ্য, গত ১১ জানুয়ারি সকাল ১০টার দিকে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল সীমান্ত এলাকায় মায়ানমারে চলমান সশস্ত্র সংঘর্ষের সময় মায়ানমার দিক থেকে ছোড়া একটি গুলিতে গুরুতর আহত হয় শিশু হোজাইফা। প্রথমে তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। এর আগে শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকার জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হোজাইফার মৃত্যুর খবর পরিবারে পৌঁছালে তার মা কান্নায় ভেঙে পড়েন। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকা বাবা জসিম উদ্দিন শোক সহ্য করতে না পেরে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন।
মনোয়ারুল হক/
