তফসিলের পর নিরাপত্তা শঙ্কা, উদ্বেগে ইসি ও প্রার্থীরা
নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (১৯ ডিসেম্বর) : জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরই দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। নির্বাচন কমিশন (ইসি), প্রার্থী এবং নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে কমিশন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে এবং ১৩ দফা গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা নির্দেশনা বাস্তবায়নে জোর দিয়েছে।
তফসিল ঘোষণার ২৪ ঘণ্টা পেরোতেই ঢাকার একটি আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদিকে গুলিবিদ্ধ করার ঘটনা ঘটে। একই রাতে দেশের দুই জেলায় নির্বাচন অফিসে অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া যায়। এসব ঘটনার পর একাধিক প্রার্থী ব্যক্তিগত ও দলীয় নিরাপত্তা চেয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন করেছেন।
এদিকে মাঠপর্যায়ে প্রার্থীদের শক্তি প্রদর্শন, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়ছে। পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে নির্বাচন কমিশন ধারাবাহিকভাবে নির্দেশনা জারি করছে। ভোট ঘিরে সহিংসতার আশঙ্কায় ভোটার, প্রার্থী ও পর্যবেক্ষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—প্রশাসন কতটা প্রস্তুত?
নিরাপত্তা চেয়ে প্রার্থীদের আবেদন
নির্বাচনী কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের মধ্যেই গত বুধবার দুই সম্ভাব্য প্রার্থী নির্বাচন কমিশনের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেন। তারা হলেন—আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও বরিশাল-৩ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এবং কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী রেহা কবির সিগমা। আবেদনে তারা নিজেদের পাশাপাশি কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন পাওয়া মানেই বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া হচ্ছে—এমনটি নয়। প্রতিটি আবেদন গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
নির্বাচন অফিস ও কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা জোরদার
তফসিল ঘোষণার পর দেশের সব আঞ্চলিক, জেলা, উপজেলা ও থানা নির্বাচন অফিসের নিরাপত্তা বাড়াতে আইজিপিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এসব অফিসে নির্বাচনি সরঞ্জাম, গুরুত্বপূর্ণ নথি ও সংবেদনশীল তথ্য থাকায় পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইসি সূত্র জানায়, সারাদেশে ৬৯ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও পাঁচ শতাধিক সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনার রিটার্নিং কর্মকর্তাদের জন্য গানম্যান নিয়োগ এবং অন্যান্য এলাকায় বাড়তি পুলিশি নজরদারি চালু করা হয়েছে।
ইসি ভবন ও কমিশনারদের নিরাপত্তা
প্রধান নির্বাচন কমিশনার, চার নির্বাচন কমিশনার ও ইসি সচিবের নিরাপত্তাও বাড়ানো হয়েছে। তাদের বাসভবন, অফিসে যাতায়াত এবং নির্বাচন ভবনের সার্বিক নিরাপত্তায় অতিরিক্ত পুলিশি এসকর্ট ও নজরদারি নিশ্চিত করতে ঢাকা মহানগর পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য ১৩ দফা নির্দেশনা
নির্বাচন কমিশন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী ও নাশকতাকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান, গুজব ও অপতথ্য নিয়ন্ত্রণ, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগে সহায়তা এবং নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটিকে প্রয়োজনীয় পুলিশি সহায়তা প্রদান।
ইসির পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তুতি
নির্বাচনী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব বাহিনীর সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছে নির্বাচন কমিশন। এ বিষয়ে কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, নির্বাচন যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সে লক্ষ্যে সারাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ইসির একটি পৃথক মনিটরিং সেল সার্বক্ষণিক কাজ করছে।
তবে তফসিল ঘোষণার পরপরই নির্বাচন অফিসে অগ্নিসংযোগ ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এসব বিষয়ে কমিশনের বার্তা জানতে চাইলে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিশেষ অভিযানসহ সর্বক্ষণিক সমন্বয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করতে নির্বাচন কমিশন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
মনোয়ারুল হক/
