মুক্তিযুদ্ধকে ‘প্রতিরোধ যুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ ৪৭ তম বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (৬ ডিসেম্বর) : বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ পরীক্ষা বিসিএস। সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) পরিচালিত এ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি ও মাননিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ সতর্কতা গ্রহণ করা হয়। এই পরীক্ষায় জাতীয় ইতিহাসের প্রতি যথাযথ সংবেদনশীলতা বজায় রাখা হয়। তবে ধারাবাহিক ভুল ও অসঙ্গতি সেই আস্থার জায়গায় এরই মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করেছে। সর্বশেষ ৪৭তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার ‘বাংলাদেশ বিষয়াবলি’ প্রশ্নপত্রে মুক্তিযুদ্ধকে ‘প্রতিরোধ যুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করায় নতুন করে দেশব্যাপী তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে শিক্ষাবিদ পর্যন্ত, সবার নজর এখন পিএসসির দিকে। প্রশ্নপত্রে এই ভুলের কোনো ব্যাখ্যা এখনো দেয়নি পিএসসি।

৪৭তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা শুরু হয় গত ২৭ নভেম্বর। গত ৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশ বিষয়াবলি’ বিষয়ের পরীক্ষা। সেদিন ‘মহানন্দা’ সেটের প্রশ্নে লেখা হয়- ‘‘১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ‘দখলদার বাহিনীর’ বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ‘প্রতিরোধ যুদ্ধের’ সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিন।’’ মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক নাম উল্লেখ না করে ‘প্রতিরোধ যুদ্ধ’ শব্দচয়ন এবং পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী ‘দখলদার বাহিনী’ নামে তুলে ধরায় পরীক্ষার্থীদের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষোভ তৈরি হয়। শুরু হয় নানা আলোচনা-সমালোচনা। প্রশ্নপত্রের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় ব্যাপক সমালোচনা। ফেসবুক, এক্সসহ বিভিন্ন সামাজিক প্ল্যাটফর্মে মানুষ প্রশ্ন তুলতে থাকেন – এটি কি ভুল? না উদ্দেশ্যমূলক?

ইতিহাসবিদদের মতে, ‘প্রতিরোধ যুদ্ধ’ কোনোভাবেই বাংলাদেশে প্রচলিত বা স্বীকৃত পরিভাষা নয়। বরং একাত্তরের যুদ্ধকে এভাবে উল্লেখ করা পাকিস্তানের অতীত রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে অনেক সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই শব্দচয়নকে অনেকেই ‘ইতিহাস বিকৃতি’ বা ‘ইতিহাসের ভাষা বদলে দেওয়ার একটি নীরব প্রচেষ্টা’ হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন।

দেশের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় ভুল বা বানানসংকট এবারই প্রথম নয়। এর আগেও বিসিএসের প্রশ্নপত্রে নানা ধরনের অসঙ্গতি দেখা গেছে। এর আগে চলতি বছরের ১০ অক্টোবর ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের প্রিলিমিনারি এবং লিখিত পরীক্ষায়ও একই ধরনের প্রশ্নবিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সেই পরীক্ষায় পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর, পাকিস্তানের ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন, এমনকি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বাদ দিয়ে তুলনামূলক কম প্রাসঙ্গিক ও বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন রাখা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তখনো প্রশ্ন উঠেছিল, বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যখন মুক্তিযুদ্ধ, তখন তা কি এড়ানোর চেষ্টা চলছে?

সেবার ৪৯তম বিসিএসের প্রিলিমিনারিতে প্রশ্ন ছিল, ‘সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করে যাওয়া পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত?’ আবার প্রশ্ন করা হয়েছিল- ‘১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে ছিলেন?’ এর পাশাপাশি বাংলা ভাষা আন্দোলন ও ব্যাকরণ সম্পর্কিত কিছু প্রশ্নেও ভুল বা অসংগতি দেখা যায়। ফলে পরীক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের কাছে পিএসসির প্রশ্নপত্র প্রণয়ন পদ্ধতি ও নেপথ্যের ব্যক্তিরা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।

এরও আগে, চলতি বছরের ২১ মে প্রকাশিত ৪৮তম বিশেষ বিসিএসের সিলেবাস নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্যাডারের জন্য নির্ধারিত সিলেবাসে জাতীয় ইতিহাসের মূল অংশ, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, এসবকে উল্লেখযোগ্যভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাবিদদের মতে, সিলেবাসের এমন পরিবর্তন আকস্মিক এবং ব্যাখ্যাতীত।

বিসিএসের প্রশ্নপত্রের এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক লেখক ও গবেষক সালেক খোকন বলেন, প্রশ্নে পাকিস্তান শব্দটি বাদ দিয়ে কেবল ‘দখলদার বাহিনী’ বলা হয়েছে। এটি পাকিস্তান শব্দটিকে এড়িয়ে যাওয়ার সচেতন প্রয়াস হতে পারে। বাংলাদেশ তো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, লাখো শহিদের আত্মত্যাগ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের ওপর দাঁড়িয়ে স্বাধীন হয়েছে। সেই ইতিহাসের প্রশ্নপত্রেই যদি শব্দচয়ন বদলে যায়, তাহলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। এখানে এক ধরনের টেকনিক্যাল ওয়ার্ড ব্যবহার করা হয়েছে। এর চেয়ে ৭১-এর প্রশ্ন না দিলেই ভালো। বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন করা উচিত নয়।

তার মতে, আগে ইতিহাসের অতিরঞ্জন দেখেছি, এখন দেখছি সরাসরি ইতিহাসকে বিকৃত করা হচ্ছে- পিএসসি এমন সব প্রশ্ন করেছে। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে প্রতিষ্ঠানটির কাছে কোনো জবাব চাওয়া হয়নি! তার মানে এ সংস্থায় যারা রয়েছেন তারা ৭১-কে মানেন কি না, এমন প্রশ্ন দাঁড়ায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে গবেষক, শিক্ষক, প্রশাসনিক প্রশিক্ষক- সবাই এখন পিএসসির ব্যাখ্যা চাচ্ছেন। তারা বলছেন, বিসিএসের মতো ইতিহাস-সংবেদনশীল পরীক্ষায় এ ধরনের ভুল বা বিকৃতি ভবিষ্যতে আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। যে পরীক্ষার্থীরা একদিন দেশের রাষ্ট্র কাঠামোর পদে যাবে, তাদের মূল্যায়নের প্রশ্নেই যদি ইতিহাসের ভাষা বিকৃত হয়, তবে তা রাষ্ট্রের সামগ্রিক বোধ ও চিন্তাব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমের সঙ্গে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি। তবে সংস্থাটির জনসংযোগ কর্মকর্তা এস এম মতিউর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, এ বিষয়ে কমিশন এখনো কোনো মন্তব্য করেনি। তাই কিছু বলা যাচ্ছে না।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ