শিক্ষাক্রমে যুক্ত হচ্ছে নতুন ৪ বই, থাকছে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ

নিউজ ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২৪ অক্টোবর): মুখস্থনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক পড়াশোনার বৃত্ত ভেঙে শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দক্ষ করে তুলতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের দুটি শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে চারটি ভিন্নমাত্রার নতুন পাঠ্যবই। শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, সৃজনশীলতা ও বাস্তবমুখী কর্মদক্ষতা বাড়াতে এগুলো তৈরি করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এর মধ্যে চতুর্থ শ্রেণির জন্য প্রণীত হয়েছে ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য আসছে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষাব্যবস্থাকে জীবনমুখী ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, গবেষণা ও নির্দেশনার আলোকেই এনসিটিবি এই চার নতুন পাঠ্যপুস্তক চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কারে হাত দিয়েছেন। শিক্ষাকে আনন্দময় ও বাস্তবমুখী করার পেছনে তাঁর বহু বছরের ভাবনা কাজ করেছে।

তিনি আরও জানান, বিগত ১৫ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করে যতটুকু অনুধাবন করা গেছে— তিনি চান শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক শিষ্টাচার, পারিবারিক সংস্কৃতি ও সুনাগরিকের গুণ বিকশিত হোক, যা একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তাঁরই নির্দেশনায় এনসিটিবিকে এই কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়। পলিসি প্রণয়নকারী ও বরেণ্য শিক্ষাবিদদের নিয়ে গঠিত বিশেষ টিম ধারাবাহিক বৈঠক ও কনসালটেশনের মাধ্যমে এই রূপকল্প বাস্তবায়ন করছে।

এনসিটিবি সূত্রে জানা যায়, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে মিলিয়ে আনন্দ, খেলাধুলা, সংস্কৃতি এবং হাতে-কলমে কারিগরি দক্ষতার সমন্বয়ে এই বইগুলো সাজানো হয়েছে। আগামী ২৫ জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) সভায় বইগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার কথা রয়েছে। এরপরই প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ কপি বই মুদ্রণের জন্য প্রেসে পাঠানো হবে।

এ প্রসঙ্গে এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা জানান, বইগুলোর পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও ভ্যালিডেশন কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে। ২৫ অক্টোবর এনসিসি সভায় অনুমোদনের পরপরই এগুলো মুদ্রণ শুরু হবে।

এছাড়া আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে গত ১২ জুলাই চার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় বইগুলোর রূপরেখা উপস্থাপিত হয়। এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর মোহাম্মাদ আবু নাসের টুকু আশা প্রকাশ করেছেন যে, এনসিসি কমিটির অনুমোদনের পর আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি কপি বইয়ের মুদ্রণ কাজ পুরোপুরি শেষ হবে।

খেলাধুলা: সুস্থ জীবনধারা ও আত্মরক্ষার কৌশল

শিশুদের বয়স ও মানসিক বৃদ্ধির কথা মাথায় রেখে চতুর্থ শ্রেণির জন্য ১৪টি গতিশীল অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে ‘খেলাধুলা’ বইটি। এর মূল লক্ষ্য শৈশব থেকেই শিক্ষার্থীদের ক্রীড়াচর্চা ও সুস্থ জীবনধারায় উদ্বুদ্ধ করা।

বইটিতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস ও দাবাসহ বিভিন্ন খেলার মৌলিক নিয়মকানুন সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতা ও আত্মরক্ষা শেখাতে কারাতে, জুডো ও তায়কোয়ান্দোর কৌশল রাখা হয়েছে। মাঠে ছোটখাটো ইনজুরি, রক্তপাত কিংবা হিট স্ট্রোকে করণীয় বিষয়গুলো বাস্তবসম্মত ছবির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসা ও পুষ্টির পাশাপাশি এতে দেশপ্রেমের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

বইটির প্রথম অধ্যায়ে ‘স্বপ্ন যখন আকাশ ছোঁয়া’ শিরোনামে একটি অনুপ্রেরণামূলক গল্প রয়েছে, যেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক বিদ্যালয়ে মেয়েদের ফুটবল দল গঠন এবং সামাজিক বাধা পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সাফল্যের গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এনসিটিবি চেয়ারম্যান জানান, পড়াশোনা যাতে শিক্ষার্থীদের জন্য ক্লান্তিকর না হয়, সে বিষয়টি মাথায় রেখেই বইটি প্রথমবার প্রণয়ন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি: ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও নতুন কুঁড়ি

দেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে শিশুদের পরিচয় করাতে ১১টি অধ্যায়ে তৈরি করা হয়েছে ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইটি। এতে ভাষা, পোশাক, শিল্পকলা, খাদ্যভ্যাস, সামাজিক রীতিনীতি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনধারা বর্ণিলভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

বইটিতে বাংলা বর্ণমালা চর্চা, বিদ্যালয় উৎসব, জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও পিঠা-পুলির পাশাপাশি যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও গৃহস্থালির পারস্পরিক সহযোগিতার আধুনিক রূপ স্থান পেয়েছে। এছাড়া বিশেষ অধ্যায়ে শিশু-কিশোরদের জনপ্রিয় প্রতিভা অন্বেষণমূলক আয়োজন ‘নতুন কুঁড়ির’ ইতিহাস, ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ এবং বিজয়ীদের দুর্লভ ছবি যুক্ত করা হয়েছে।

লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস: ভীতিহীন ও আনন্দময় শিখনদর্শন

পড়াশোনাকে ভীতিমুক্ত ও আনন্দদায়ক করার উদ্দেশ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য ৬টি অধ্যায়ে প্রণীত হয়েছে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বইটি। প্রচলিত পরীক্ষার চাপ কমিয়ে আনন্দময় অভিজ্ঞতা ও পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের এক নতুন ধারণা এটি। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার আলোকেই শিখনফল অর্জনে সক্ষম হবে। শেখা যে শুধু মুখস্থ বা পরীক্ষার বিষয় নয়, বরং জীবন ও পারিপার্শ্বিকতার মধ্য দিয়েও সম্ভব—তা এই বইটিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

আমার কারিগরি শিক্ষা: ছোট উদ্যোগ, বড় সম্ভাবনা

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হাতে-কলমে শেখার অভ্যাস তৈরিতে ৮টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে ষষ্ঠ শ্রেণির ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বই। শিক্ষার্থীকে শুধু তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘আমি কী করতে পারি’—সেই আত্মনির্ভরশীলতা তৈরিই এর মূল দর্শন।

কারিগরি শিক্ষার পরিচিতি, চারপাশের প্রযুক্তি, ছোট উদ্যোগের সম্ভাবনা, সবুজ প্রযুক্তি ও টেকসই জীবনযাপনের পাশাপাশি বাস্তব জীবনের নানা কারিগরি সমস্যা চিহ্নিত করে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে সমাধান খোঁজার ভিত্তি গড়ে তুলবে এই বইগুলো। এছাড়া নতুন এই চারটি বইয়েই বিশেষ শব্দকোষ যুক্ত করা হয়েছে।

উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানান, চতুর্থ শ্রেণি থেকে শুরু হওয়া ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বিষয় দুটি পরবর্তীতে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হবে। অন্যদিকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ এবং কারিগরি শিক্ষা বিষয় দুটি ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব ক্লাসের পাঠ্যক্রমে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সূত্র: বাসস

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ