রেজা কিবরিয়ার যোগদানে হবিগঞ্জ বিএনপিতে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক (হবিগঞ্জ), এবিসিনিউজবিডি, (৩ ডিসেম্বর) : বিএনপিতে যোগদানকে কেন্দ্র করে হবিগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ নেতা শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া।

গত সোমবার সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যোগদান সম্পন্ন করেন তিনি। আর এর মধ্য দিয়েই সামনে এসেছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ; বিশেষ করে হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনকে ঘিরে আলোচনা তুঙ্গে। তার বিএনপিতে যোগদান করাকে কেন্দ্র করে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।

এর আগে একাধিকবার ড. রেজা কিবরিয়া প্রকাশ্যে বলেছিলেন তিনি হবিগঞ্জ-১ আসন থেকেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে চান। বিএনপিও এখন পর্যন্ত আসনটি ফাঁকা রেখেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, আসন্ন নির্বাচনে তিনি ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, এটা এখন অনেকটাই স্পষ্ট।

বারবার দলবদলে সমালোচনা
রাজনীতিতে রেজা কিবরিয়ার পরিচিতি ‘ক্লিন ইমেজ’ নেতা হিসেবে। তবে বারবার দলবদল নিয়ে প্রবল সমালোচনাও রয়েছে। ২০১৮ সালে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরামে যোগ দিয়ে তিনি দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন এবং একই বছরের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে হবিগঞ্জ-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সেই নির্বাচনে তিনি উল্লেখযোগ্য ভোটও পান। যদিও ওই নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভোট বর্জন ঘোষণা করে বিএনপিসহ জোটের দলগুলো।

পরে অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও মতপার্থক্যের কারণে গণফোরাম ছাড়েন রেজা। ২০২১ সালে নুরুল হক নুরকে সঙ্গে নিয়ে গঠন করেন গণঅধিকার পরিষদ। সেখানে আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তবে দলটি ভাঙনের মুখে পড়লে সেখান থেকেও বেরিয়ে যান। যোগ দেন আমজনতার দলে। সবশেষ এবার বিএনপিতে যোগদান করলেন।

জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন!
হবিগঞ্জে রেজা কিবরিয়াকে ঘিরে জনমনে আশা ও প্রশ্ন- দুই-ই সমানভাবে রয়েছে। রেজা কিবরিয়ার যোগদানকে স্বাগত জানালেও হবিগঞ্জ-১ আসনে তাকে মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে নীরব আপত্তিও রয়েছে অনেকের। তারা বলছেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর আর এলাকায় পা রাখেননি তিনি।

নবীগঞ্জ শহরের গাজীরটেক এলাকায় কথা হয় স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘রেজা কিবরিয়া একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। তাকে নিয়ে নবীগঞ্জবাসী গর্ব করি। বিএনপিতে যোগদান করায় আশা করছি আগামী সরকারে আমাদের এলাকার সন্তানকে অর্থমন্ত্রী হিসেবে দেখতে পাব। এর মাধ্যমে সরকার ও দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।’

তবে রেজা কিবরিয়াকে নিয়ে কিছু আপত্তিও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্যে, ‘২০১৮ সালের নির্বাচনের পর তিনি আর এলাকায় আসেননি। এটাকে জনগণ খুব ইতিবাচকভাবে নেবে বলে মনে হয় না। সে ক্ষেত্রে ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি যে সাড়া পেয়েছিলেন এবার তা না-ও পেতে পারেন। কারণ ভোটাররা এমন একজন প্রতিনিধিকে সংসদে পাঠাতে চান, যিনি এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থাকবেন।’

নবীগঞ্জ শহরের আরেক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘রেজা কিবরিয়া একজন যোগ্য অর্থনীতিবিদ, দেশের জন্য অনেক কিছু করতে পারেন। তবে আমাদের এলাকার মানুষের সঙ্গে তার সংযুক্তি নেই। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর এলাকার মানুষের খোঁজ নেননি তিনি। শুধু ভোটের সময় এলাকায় আসবেন, মানুষ তাকে ভোট দেবে, এটা হতে পারে না।’

স্থানীয় বিএনপিতে ‘নীরব দ্বিমত’
রেজা কিবরিয়াকে নিয়ে স্থানীয় বিএনপির মধ্যে প্রকাশ্যে দ্বিমত না থাকলেও ভেতরে ভেতরে অনেক নেতা-কর্মীর আপত্তি রয়েছে।

নবীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘ড. রেজা কিবরিয়া আমাদের দলে যোগ দিয়েছেন, আমরা তাকে স্বাগত জানাই। তবে হবিগঞ্জ-১ আসনে তাকে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে অবশ্যই আমাদের দ্বিমত আছে। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে স্থানীয় নেতা-কর্মীরা দলের জন্য লড়াই করেছেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন; এখন যদি তাদের বঞ্চিত করা হয়, সেটা নিঃসন্দেহে অন্যায় হবে। বিএনপি সরকার গঠন করলে তাকে টেকনোক্র্যাট কোটায় অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।’

অন্যদিকে, নবীগঞ্জ পৌর বিএনপির আহ্বায়ক আলমগীর মিয়া ভিন্ন সুরে বলেন, ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ। কেন্দ্র তাকে মনোনয়ন দিলে দেশের স্বার্থেই দেবে। আমাদের আপত্তির কোনো কারণ নেই। বিএনপি যাকে মনোনয়ন দেবে, আমরা তার পক্ষেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করব এবং হবিগঞ্জ-১ আসনটি তারেক রহমানকে উপহার দেব।’

নবীগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক তৌহিদ চৌধুরী বলেন, ‘রেজা কিবরিয়া নবীগঞ্জের কৃতী সন্তান। তার বিএনপিতে যোগদান আমরা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছি। গত ২০২৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঐক্যফ্রন্ট থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং আমরা তখনো তার পক্ষে কাজ করেছি। আগামী সংসদ নির্বাচনে যদি দলের হাইকমান্ড তাকে মনোনয়ন দেয়, তবে ধানের শীষ প্রতীকের বিজয়ের জন্য আমরা একযোগে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে প্রস্তুত।’

এ বিষয়ে জানতে ড. রেজা কিবরিয়ার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এসএমএস পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ